প্রথম পর্ব:
খবরের কাগজে একটা খবরে চোখ আটকে গেল মনোরমার। জয়ন্তীতে বাঘ দেখতে পাওয়ায় পুরো এলাকাটা টাইগার রিজার্ভ এরিয়ার আন্ডারে চলে আসছে, আর তাই ‘ভুটিয়া বস্তি’ উঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ‘ভুটিয়া বস্তি’ নামটা চোখে পড়তেই বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল। একসাথে অনেকগুলো স্মৃতি ভেসে উঠল তার চোখের সামনে। ডুয়ার্স, জয়ন্তী, রোশন, জয়ন্তী নদী, অতীতের স্মৃতিমাখা ভাঙা ব্রিজ, পাতাহীন কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে থাকা কিছু গাছ, অসংখ্য পাখির গান, পলাশ ফুল আর সেই ছেলেটা…
সেটা ছিল সরস্বতী পুজোর সময়। সে বছর বসন্তের ধুলোঝড়ের মতো একটা ঝড় মনোরমাকে উথালপাথাল করে দিয়েছিল। আর সেই অশান্ত মনকে শান্ত করতেই ছুটে গিয়েছিল জয়ন্তীর কাছে। কোথাও ঘুরবে না, শুধু জয়ন্তী নদীর পারে চুপ করে বসে থাকতে গিয়েছিল সে জয়ন্তীতে।
সরস্বতী পুজো আর উইকএন্ড মিলিয়ে ছোট্ট ছুটি। সরস্বতী পুজোর আগের দিন সন্ধ্যাতেই সে পৌঁছেছিল জয়ন্তীতে। হোটেলের ঘর একদম নদীর গা লাগানো। যদিও নদীতে জল নামমাত্র। ঘরের সামনে একটা শিমুল গাছ দাঁড়িয়ে আছে আকাশের দিকে চেয়ে। একটু দূরে নদীর বাঁধের উপর গাছের ছায়ায় একটা ছোট্ট মাচা বাঁধা। এসেই ভালো লেগেছিল মনোরমার। জয়ন্তীর প্রকৃতি, শুকনো জয়ন্তী নদী, সাধারণ জীবনযাত্রা, কোলাহলবিহীন জীবন বেশ মন কেড়েছিল তার।

রাতে খাওয়ার পর ইচ্ছে হলো একটু বাইরে বাঁধের উপর বসার। চাদর জড়িয়ে বাইরে বেরোতেই একটা হালকা হাওয়া ছুঁয়ে দিয়ে গেল ওকে। লোকজন বিশেষ নেই। বাঁধের উপর গিয়ে বসল মনোরমা। দূরে মাচায় কয়েকজন লোক বসে আড্ডা দিচ্ছে। রাতের একটা মায়া ছড়ানো সীমাহীন প্রান্তরে। এ সময় একা একটা মেয়েকে হঠাৎ বসতে দেখে সবাই একটু চুপ করে গেল। মনোরমা বুঝল চোখগুলো তারই দিকে। দূরে কুকুর ডাকছে। একা বেশিক্ষণ বসার সাহস হলো না। ফিরে গেল ঘরে।
পরদিন সরস্বতী পুজো! সরস্বতী পুজোর সাথে একটা অন্যরকম ভালো লাগা আছে মনোরমার। স্কুলের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। অগোছালো হাতে হলুদ শাড়ি পরা, তারপর বন্ধুদের সাথে স্কুলে যাওয়া। নিজেদের স্কুলের পাশাপাশি সেদিন পাশের বয়েজ স্কুলে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার ছাড়ও থাকত। সেই বয়সে সে এক অদ্ভুত উন্মাদনা। তারপর ওরা যেত তাদের ছোটবেলার দোলনা স্কুলে। চেনা-অচেনা মুখের ভিড়ে আন্টিদের সাথে দেখা আর খিচুড়ি খাওয়া। বাতাসের সাথে মনেও বসন্ত তখন।
এবার সরস্বতী পুজোতে আর শাড়ি পরা হবে না। তবু সকালবেলা উঠে তাড়াতাড়ি স্নান সেরে রেডি হয়ে নিল মনোরমা। কাল আসার সময় বাজারের পাশে কিছু অল্পবয়সী ছেলে-মেয়েকে দেখেছিল মণ্ডপ সাজাতে। তখনই ঠিক করেছিল ওখানেই অঞ্জলি দেবে।
ছোট মণ্ডপ, গুটিকতক বাচ্চাকাচ্চা মিলে ছোট্ট আয়োজন; একটা ঘরোয়া আমেজ। ভালোই লাগছিল মনোরমার। ছোট ছোট বাচ্চারা শাড়ি পরে আজ কেমন প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে। এক সময় সেও এদের মতো প্রজাপতি ছিল। রঙিন ডানা মেলে উড়ে বেড়াত।
অঞ্জলি দিয়ে পাশের একটা সরু রাস্তা দিয়ে হেঁটে কিছুটা এগিয়ে গেল সে। মনোরম আবহাওয়া। বাজারের দোকানপাট পেরিয়ে এদিকটা একটু ফাঁকা। যদিও জঙ্গলের বাইরে, তবু একটা জঙ্গল-জঙ্গল অনুভূতি আছে। পায়ে পায়ে হেঁটে বেড়াতে মন্দ লাগছে না। নানা ধরনের পাখি আছে এদিকে। কোনো এক পাখির ডাক শুনতে পাচ্ছে গাছের আড়াল থেকে।
মনোরমা এদিক-ওদিক তাকাতেই দেখতে পেল পাতার আড়ালে বসে একটা হলুদ পাখি ডাকছে। ব্যাগ থেকে ক্যামেরাটা বার করে দুটো ছবি তোলার চেষ্টা করল সে। তার ছোট ক্যামেরায় পাখির ভালো ছবি তোলা মুশকিল। তবু ইচ্ছে হয় মাঝে মাঝে স্মৃতিদের বন্দি করতে।
ক্যামেরাটা চোখ থেকে নামাতেই শুনতে পেল—
— “ভালো কিছু পেলেন?”
মাথা ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো মনোরমা। তারই বয়সী একটা ছেলে, অথবা দু-এক বছরের ছোটও হতে পারে। ব্লু জিন্স আর সাদা টি-শার্ট গায়ে। চেহারা দেখে লোকাল মনে হচ্ছে না, আবার ঠিক ট্যুরিস্টদের মতোও গোছানো নয়। চেহারায় শহুরে ছাপ, তবে একটা অগোছালো ভাব। অথচ চোখ দুটোতে এমন কিছু আছে যা ইগনোর করা যায় না।
তবু এই মুহূর্তে মনোরমার বিশেষ কথা বলার ইচ্ছে ছিল না। তাই একটু কাটানোর ভঙ্গিতেই বলল—
— “বিশেষ ভালো কিছু না।”
— “ঘুরতে এসেছেন বুঝি? কোন হোটেলে উঠেছেন?”
— “ওই যে জয়ন্তী বাঁধের ধারে প্রথম যে হোটেলটা আছে।”
— “ও! জগদীশদার হোটেল? খুব ভালো লোকেশন! একা?”
মনোরমা একটু একা সময় কাটাতে চায়। এই মুহূর্তে তার একটুও অচেনা, গায়ে পড়া কারও সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। সে শুধু ‘হুম’ বলে মৃদু হেসে অন্য পথ নিল।
উদাস দুপুরে একা একা হেঁটে বেড়াতে বেশ ভালো লাগছিল মনোরমার। অনেকদিন শুধু নিজের সাথে কাটানো হয়নি। অনেকগুলো প্রশ্ন নিজের কাছে, যার উত্তর তাকেই খুঁজে পেতে হবে। আজকাল মনে হয় নিজেকেই সে বোঝে না। নিজের মনের হদিস নিজেই পায় না। আস্তে আস্তে হোটেলের দিকে ফিরে চলল মনোরমা। দূরে মাইকে তখনও বাংলা গান ভেসে আসছে…


দ্বিতীয় পর্ব:
আজ ওর একটু সাহস বেড়েছে। ঠিক করেছে, রাতে তাড়াতাড়ি খেয়ে উঠে বাঁধের উপর বসবে। প্ল্যানমতো তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে বাঁধের উপর গিয়ে বসল সে। সামনে জয়ন্তী নদী। খুব অল্প একটু জায়গা দিয়ে শুধু জল বয়ে চলেছে, বাকিটা শুকনো, পাথুরে। সেই পাতাবিহীন শুকনো গাছপালাগুলো অন্ধকারে কেমন অদ্ভুত লাগছে। দূরে ভাঙা ব্রিজ যেন তার সব অতীতের গল্প নিয়ে অপেক্ষা করছে দিন শেষের। পঞ্চমীর চাঁদ আকাশে। দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে।
আজ মাচার উপর লোকজন নেই। বেশ নিঝুম একলা পৃথিবী। নীরবতার যেন নিজের একটা ভাষা আছে। অদ্ভুত সুন্দর সে ভাষা। নিস্তব্ধ রাত। মনোরমার কিছু ভাবতে ইচ্ছে করছে না। ভেতরটা কেমন ফাঁকা মনে হচ্ছে। জানে না জীবন তাকে কোন পথে নিয়ে যাচ্ছে। যে পথে সে হাঁটছে, মন বলছে— “হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে।”
যেন হারিয়ে যাওয়া কিছু খুঁজে পাচ্ছে না মন। অথচ সে নিজেও জানে, যে পথটা খুঁজছে আদৌ সে পথ আছে কিনা। বড় ক্লান্ত সে। প্রকৃতি একমাত্র জায়গা যা তাকে শান্ত করে, যেন মাথায় হাত বুলিয়ে যায়। আর জয়ন্তীর মন-কেমন-করা রূপ, বসন্তের শিরশিরে বাতাস, একা নিস্তব্ধ রাত, আধুনিকতার বাইরের একটা জীবন—শান্তি ছড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে তার শরীরমন জুড়ে। ভাবছে, যদি সে পারত, আর ফিরত না তার চেনা মানুষের পৃথিবীতে।এখানেই থেকে যেতে চিরকাল , এমনি ভাবে একলা রাতের সাথে, এমনি ভাবে নীরবতার সাথে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই তার চিন্তার পর্দা কেটে ফিরে আসতে হলো বাস্তবের পৃথিবীতে। সে যেখানে বসে আছে, তার কাছেই একদল ছেলে এসে শুকনো নদীর বুকে বসল। সঙ্গে রঙিন বোতল। মনোরমা বুঝল, আজও আর বেশিক্ষণ বসা হবে না তার। দিনকাল বড় খারাপ! ছেলে হলে হয়তো এসব ভাবতে হতো না। মাঝে মাঝে মনে হয়, কেন তাকে মেয়ে হয়েই জন্মাতে হলো? কেন সে শুধুই মানুষ হতে পারল না?
II
বেশ ভোরেই ঘুম ভেঙেছে ওর। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়েই বাইরে বেরোল সে। দেখল যেন অন্য জগৎ। এখনও ভালো করে আলো ফোটেনি। কুয়াশার চাদর জড়িয়ে রেখেছে চারপাশ। এক অদ্ভুত রহস্যময়, মায়াবী রূপ জয়ন্তীর। তার ঘরের সামনের শিমুল গাছটার নীচে শিশিরমাখা শিমুল ফুল বিছিয়ে আছে। মনোরমার বড় ইচ্ছে করল এই কুয়াশায় হারিয়ে যেতে বহু দূরে।
বাঁধ ছেড়ে আস্তে আস্তে নদীতে নামল সে। কাছাকাছি জল নেই। ছোট পাথুরে শুকনো নদী। এরই মধ্যে কুয়াশা মেখে নিঃশব্দে কিছু ভক্তের দল চলেছে মহাকালের পথে। মনোরমাও এগিয়ে চলল নদীর মাঝখানে। একটু এগিয়ে চোখে পড়ল কুলকুল করে জল বয়ে যাচ্ছে। কিছু ছোট-বড় পাথরে পা দিয়ে দিব্যি সেই জল পার হয়ে যাওয়া যায়। সে জলের ধারা পেরিয়ে ওপারের দিকে এগিয়ে গেল।
নানা রকমের ছোট-বড় পাথর ছড়িয়ে আছে চারপাশে। শুকনো গাছের ডাল পড়ে আছে এদিক-ওদিক। কুয়াশায় সব কেমন রহস্যময় লাগছে। নদীর ওপারের দিকে অবাক হয়ে দেখল সে। এপারে এত হোটেল, এত জমজমাট, অথচ উল্টো দিকটা যেন ফাঁকা, নির্জন। ভোরের আলো আর কুয়াশায় কেমন যেন স্বপ্নের দেশ মনে হচ্ছে। সেই দেশ, যেখানে সারা বছর সুখেরা বৃষ্টি হয়ে ঝরে।
এসব ভাবতে ভাবতেই চোখে পড়ল কুয়াশার মধ্যে আবছা কিছু একটা। একটু এগোতেই বুঝল, কালকের সেই ছেলেটি। সঙ্গে একটি বাচ্চা ছেলে। বাচ্চাটাকে দেখে মনে হচ্ছে লোকাল। দু’জনে পাথরের উপর বসে কী যেন করছে। এই জনমানবহীন জায়গায়, ভোরের কুয়াশা মেখে কী করছে ওরা?
পায়ের আওয়াজে দু’জনেই একসাথে পিছন ফিরে তাকাল। মনোরমাকে দেখে কিছুটা অবাক তারাও!
— “এত সকাল সকাল একা একা বেরিয়েছেন? আপনার সাহস আছে বলতে হবে।”
মনে মনে ভাবল মনোরমা, সত্যিই তো, তার ভাবা উচিত ছিল। অচেনা জায়গা! কত রকম বিপদ হতে পারে! তবে মুখে বলল অন্য কথা।
— “একা ঘুরতে এসে একা একা না বেরোলে চলে? আর তাছাড়া ভোরবেলা চারপাশ এমন মায়াবী লাগছিল যে লোভ সামলাতে পারলাম না।”
এমনিতে মানুষজন মনোরমা এড়িয়ে চলতেই ভালোবাসে, তার ওপর অচেনা হলে তো কথাই নেই। কিন্তু এমন নরম ভোর মনোরমার মন নরম করে দিয়েছিল। আজ তার কথা বলতে মন্দ লাগছিল না।
ছেলেটা বলল—
— “এখন মহাকালে প্রচুর দর্শনার্থী যাচ্ছে। সারারাতই লোক চলাচল করছে। এই সময় ভয় নেই। তবে জঙ্গলের দিকে একা না বেরোনোই ভালো। জন্তু জানোয়ারের তো অভাব নেই।”
— “সেটা বুঝলাম। তবে আপনারা এত সকালে কী করছেন এখানে?”
একটা শুকনো গাছের ডাল দেখিয়ে সে বলল—
— “এটা দেখেছেন? কেমন সুন্দর শেপ না? ‘কাটুম-কুটুম’-এর নাম শুনেছেন? আমার একটা hobby বলতে পারেন। তাই এসব সংগ্রহ করতে ভালোবাসি।”
মনোরমা ভালো করে দেখে সত্যিই অবাক হলো। ডালটা এমনভাবে বাঁকানো, যেন একটা মা কোলে বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
— “বাহ! বেশ সুন্দর তো!”
— “হুম। একটু চোখ খোলা থাকলে দেখবেন, আপনার আশেপাশে কত সুন্দর পৃথিবী!”
তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল—
— “চা খাবেন?”
— “আমি বিশেষ চায়ের ভক্ত নই। তবে এমন দিনে চা পেলে মন্দ হতো না। কিন্তু এখানে, এই নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে তো আর সে উপায় নেই!”
— “চলুন না, ভুটিয়া বস্তি থেকে চা খেয়ে আসি।”
মনোরমা নদীর ওপারে তাকাল। তার তো অনেকক্ষণ থেকেই ইচ্ছে করছিল ওপারটায় হারিয়ে যেতে। অথচ যখন প্রস্তাবটা পেল, ঠিক কী বলা উচিত বুঝতে পারল না। মন বলছে— “মনোরমা, ভেসে যাও।”, মাথা বলছে— “এভাবে যাওয়াটা কতটা নিরাপদ ? ” মাথা আর মনের দ্বন্দ্ব তার চিরকালের। আর এই লড়াইয়ে সে সবসময় মাথাকেই জিতিয়েছে। তবু আজ মাথাকে ভীষণ হারাতে ইচ্ছে করল…





তৃতীয় পর্ব:
মনোরমাকে চুপ করে থাকতে দেখে ছেলেটিই বলল,
— “ভরসা করে যেতে পারেন। আপনার মন্দ লাগবে না।”
মনোরমা নিজের জগতে কেমন হারিয়ে ছিল। ভাবল, অনেক চেনা মানুষকেই তো ভরসা করল, বিশ্বাস করল। তারা সবাই কি রেখেছে সে বিশ্বাস, সে ভরসা? মানুষ চেনা কি জীবনে আদৌ সহজ? নিজেকেই কি সে ভরসা করে? নিজেকেই কি সে চেনে?
জীবনে কখনো কখনো স্রোতে ভেসে যেতে হয়। যে কূলে নিয়ে তোমায় স্রোত থামবে, সেখান থেকেই নতুন যাত্রা শুরু করতে হয়। তাই আজ জিতিয়ে দিল মনকে। রাজি হয়ে গেল।
— “চলুন তবে।”
যদিও আলো ফুটেছে, তবুও চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা। ওরা চুপচাপ হাঁটতে লাগল। মনোরমার এই এক সমস্যা। একটা সময় যে মেয়েটা কথা বলতে শুরু করলে বকবক থামানো যেত না, আজ সে মেয়েটা মানুষের সঙ্গে কথা বলার কথা খুঁজে পায় না। সত্যিই সময় কত বদলে দেয় মানুষকে। নীরবতা ভেঙে ছেলেটিই প্রথম কথা শুরু করল। টুকটাক কথায় পথ চলতে লাগল ওরা।
কথায় কথায় জানা গেল ছেলেটির বর্তমান নিবাস কলকাতা। নাম শুভ। আইটি-তে কাজ করে। ছোটবেলার অনেকটাই কেটেছে উত্তরবঙ্গের জঙ্গলে। তার মধ্যে জয়ন্তীতেই কেটেছে বহু বছর। তাই জয়ন্তী তার কাছে দ্বিতীয় বাড়ির মতো । বাবা গত হয়েছেন বহু বছর। মা আর ছেলে ছিল সুখের সংসার। গত বছর তার মাও চলে গেছেন। ক্যান্সারে ভুগেছিলেন শেষের বেশ কিছুদিন।
বলল, —“জয়ন্তী আমার মনের খুব কাছের জায়গা। মন খারাপেও জয়ন্তী, মন ভালো থাকলেও জয়ন্তী।”
মনোরমা ভাবছিল, মানুষকে বোঝা কত কঠিন! যাকে কাল গায়ে পড়ে কথা বলতে দেখে বিরক্ত লেগেছিল, আজ তার জন্যই মন খারাপ লাগছে। কতই বা বয়স ছেলেটার! এই বয়সেই বাবা-মা হারা। কাছের আত্মীয়স্বজনও নাকি তেমন নেই। তবু কী হাসিখুশি, কী প্রাণবন্ত!
হঠাৎ শুভ বলল,
— “আচ্ছা, কী এত ভাবেন আপনি বলুন তো? কালও দেখেছি কোথায় যেন হারিয়ে যান!”
মনোরমা একটু লজ্জা পেল। সে নিজেও জানে এ তার একটা বড় দোষ। থেকেও যেন থাকে না। কোথায় যেন হারিয়ে যায়। কী যেন খুঁজে বেড়ায় সারাক্ষণ। হয়তো সেই স্বপ্নের জগৎ, যেখানে সুখেরা সারাবছর বৃষ্টি হয়ে ঝরে, পাখিরা গান গেয়ে যায়, ফুলেরা বিছিয়ে থাকে মাটিতে !
নদী পেরিয়ে ওপারে উঠল ওরা। এদিকটা সত্যিই নিরিবিলি। আর এত সকাল বলে হয়তো আরও বেশি নির্জন মনে হচ্ছে। অন্য কেউ হলে নিশ্চয়ই এভাবে আসত না। কিন্তু সে তো চিরকালই সৃষ্টিছাড়া। জগতের নিয়মের উল্টো চলতেই সে ভালোবাসে।
একটু এগিয়ে ভুটিয়া বস্তির দিকে ঢোকার আগে শুভ আঙ্গুল দিয়ে সামনে দিকে দেখিয়ে বললো, ‘ওই দিকটায় জঙ্গলের ভেতর একটা ওয়াচ টাওয়ার আছে, কাছেই। তবে পারমিশন ছাড়া ওদিকটায় যাওয়া যায় না।‘
আরও একটু এগিয়ে বাঁদিকে একটা সরু রাস্তা ধরল ওরা। ওই রাস্তা দিয়েই ভুটিয়া বস্তি।
দু-চারটে ঘর নিয়ে ছোট্ট জনবসতি। সঙ্গে থাকা বাচ্চা ছেলেটি রোশন। তার বাড়ি এই গ্রামেই। ওরা একটু এগিয়ে রোশনদের বাড়ির সামনে পৌঁছাল।
ওদের আওয়াজ শুনে এক মহিলা বেরিয়ে এলেন। শুভ হেসে বলল,
— “চা খাওয়াবে তো?”
দেখেই বোঝা গেল শুভ ওদের পুরনো পরিচিত। সঙ্গে মনোরমাকে দেখে মহিলা তাড়াতাড়ি বসার ব্যবস্থা করতে গেলেন।
জানা গেল, উনি রোশনের মা। ছোট্ট বাড়ি, এক টুকরো চাতাল। সেই চাতালেই বসার জন্য দুটো জলচৌকি দিয়ে গেলো। একটু পর চা এল, সঙ্গে টাও। কোনো আড়ম্বর নেই, অভিজাত্য নেই। বরং দারিদ্র্যই ফুটে উঠেছে চারপাশে। তবু এই সরল, সাদাসিধে মানুষগুলো বড় মন ভালো করা। অচেনা মনোরমাকে কেমন মুহূর্তে আপন করে নিল। রোশন আর তার মা মনোরমাকে বাড়ির পেছনের সবজি বাগান দেখাতে নিয়ে গেল। একচিলতে জায়গায় নানা রকমের সবজি। একপাশে হাঁস-মুরগির ঘর। একটা বড় ড্রামে জল জমিয়ে রাখা।
মনোরমার আসার আগে যতটা সংকোচ ছিল, মুহূর্তে তা কেটে গেল। কী সাধারণ জীবনযাত্রা মানুষগুলোর! তবু মুখে অনাবিল হাসি। কোনো অভিযোগ নেই, অনুযোগ নেই।
শুভকে দেখে মনে হচ্ছে না সে এই পরিবারের বাইরের কেউ। রোশনের বাবার সঙ্গে উঠোনে বসে দিব্যি গল্প জুড়ে দিয়েছে।
এমন অনাবিল আনন্দ দেখলে মনোরমার বড় লোভ হয়। আবার কেন জানি বড় ভয়ও হয়।
জীবন বড় অপ্রত্যাশিত, বেহিসেবি। কোথা থেকে কখন ঝড় ওঠে, কেউ জানে না।
তবু আজ তার ভালোই লাগছে সব। এদের কেউই তার তেমন পরিচিত নয়, অথচ মনে হচ্ছে এদের সাথেই মিশে গেছে সে। মনে হচ্ছিল এখানেই একটা ঘর বেঁধে থেকে যায়।
শুভ আর রোশনের বাবার গল্পের টুকরো আসছিল তার কানে। কোথায় হাতির তাড়া খেয়েছে, কোথায় চা-বাগানে চিতা বেরিয়েছে, কোথায় হঠাৎ চা-বাগান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কতজনের কাজ চলে গেছে, আবার মোবাইল টাওয়ার কীভাবে জয়ন্তীর পাখিদের সর্বনাশ ডেকে আনছে—
মানুষগুলোর ছোট্ট জগতের অবাক করা সব গল্প। মনোরমাও কেমন গল্পেই এক হয়ে যাচ্ছিল ওদের সঙ্গে। তার মনে হলো, স্বপ্নরা বরাবরই সুন্দর। স্বপ্নে সবই সুখের। কিন্তু বাস্তব তা নয়। স্বপ্নে মশা কামড়ায় না। ঝড়বৃষ্টিতে ঘর ভাঙে না।কাজ চলে যায় না। দুমুঠো খাবারের জন্য প্রতিদিন যুদ্ধ করতে হয় না। স্বপ্নে আধপেটা খেয়েও সুখী মনে হয়। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। এই মানুষগুলোর জীবনের প্রতিদিনের সংগ্রামকে সে ফ্যান্টাসাইজ করে ঢেকে দিতে পারবে না।


চতুর্থ পর্ব:
বেশ সুন্দর একটা সকাল কাটিয়ে শুভ আর মনোরমার এবার ফেরার পালা। মনোরমা ততক্ষণে অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে। একা উদ্দেশ্যহীন ঘোরার এই এক মজা। পথে চলতে চলতেই তৈরি হয় পথের গল্প। আগে থেকে কোনো পরিকল্পনার দরকার পড়ে না। শুধু নিজেকে সময়ের হাতে ছেড়ে দাও। সময় তোমাকে ঠিক এগিয়ে নিয়ে চলবে, নিজের মতো করে..
ফিরে আসার পথে শুভ বলল,
— “একটা নতুন রাস্তা দিয়ে যাবেন? শর্টকাট। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাবেন।”
মনোরমা একটু থমকাল।
— “জঙ্গলের ভেতর তো ট্যুরিস্টদের যাওয়ার অনুমতি নেই, না?”
শুভ হেসে বলল,
— “আমি তো ট্যুরিস্ট নই, আর তাছাড়া আমার স্পেশাল অনুমতি আছে। আর আপনি যেহেতু আমার সঙ্গে আছেন, তাই অসুবিধে নেই। এই জায়গার প্রায় সব রাস্তাই আমার চেনা। বিপদ থাকলে আমি নিজেই যেতাম না।”
মনোরমা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মাথা নাড়ল।
— “চলুন।”
জঙ্গলের পথে ঢুকতেই চারপাশ বদলে গেল। শুভ একটা শুকনো ডাল তুলে নিল যদি দরকার পড়ে। মনোরমার বুক কেমন ঢিপ ঢিপ করছে।
মনোরমাকে দেখে শুভ বলল,
— “ভয় পাচ্ছেন নাকি?”
— “না… তবে একটু অদ্ভুত লাগছে।”
দিনের আলো থাকলেও জঙ্গলের ভেতরটা যেন গভীর। অদ্ভুত নিস্তব্ধতা এদিকটায়। পায়ের নিচে শুকনো পাতার খসখস শব্দ। কোথাও কোথাও পাখির ডাক, কোথাও কোথাও পোকাদের অদ্ভুত ডাক। গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে আসা আলো আর ছায়ার খেলা কেমন যেন অন্য জগৎ তৈরি করেছে। ওরা জঙ্গলের নিজস্ব শব্দকে গায়ে মেখে হাঁটতে লাগল নিস্তব্ধে।
কিছুটা এগোতেই মনোরমা বুঝল, এই পথ সত্যিই শর্টকাট। জঙ্গল পার হয়ে তারা আবার খোলা পথে এল। সামনে আবার পরিচিত নদী, সাদা কালো পাথর, দূরে বাঁধের রেখা।
এত বছর পরও ভাবলে অবাক হয় সে—কোন সাহসে ভর করে সে সেদিন এমন অচেনা রাস্তায়, এক অচেনা ছেলের সাথে, এক রহস্যময় জঙ্গলের পথে হেঁটেছিল! জঙ্গলের ভেতর দিয়ে আসার সময় কোনো বিপদের চিন্তা সেই মুহূর্তে মাথাতেই আসেনি। হয়তো ভেতরের ঝরগুলো সে সময় তাকে এতটাই ঘিরে রেখেছিল যে বাইরের কোনো বিপদের কথা ভাবার ক্ষমতাই সে হারিয়ে ফেলেছিল।
হোটেলে ফিরে এসে মনোরমার মনে পড়ল পরের দিনই তার ফেরা। এই দুদিন যেন একটা অদ্ভুত স্বপ্নের মতো কেটে গেছে। সকালে শুভ তাকে অনেক নতুন নতুন পাখি চিনিয়েছে। ছেলেটার চোখ আছে। পাখি স্পটিং-এ একেবারে এক্সপার্ট। সব পাখির নাম আর ডিটেইলস যেন ঠোঁটের আগায় লেগে রয়েছে। অনেক নতুন পাখির সাথে সাথে সে এই প্রথম মনোরমা নীলকণ্ঠ পাখিও দেখল।
কথায় কথায় শুভ বলেছিল, ‘রাতের জয়ন্তী বড় সুন্দর, আরও রহস্যময়।’ সাথে সাথে মনোরমার মনে পড়ে গেল ‘আবার অরণ্য’ সিনেমার কথা। ওই সিনেমায় সেই রাতের জয়ন্তী, সেই ভাঙা ব্রিজ দেখার পরেই সে প্রথম জয়ন্তীর প্রেমে পড়েছিল। তার মনেও খুব ইচ্ছে হয়েছিল রাতে এই মরা নদীর উপর হাঁটবে, ভাঙা ব্রিজের কাছে যাবে চাঁদের আলো মেখে। কিন্তু আগের দু’দিন সামান্য বাঁধের উপর বসতেই কেমন অস্বস্তিতে পড়েছিল যে সে আর ওই দুঃসাহসিক চিন্তা মাথায় আনেনি।
শুভ শুনেই বলল, ‘আমি আপনাকে ঘুরিয়ে আনতে পারি, তবে রাতে নয়, সন্ধ্যেবেলায়। খুব সুন্দর সন্ধ্যা নামে জয়ন্তীর বুকে। বদলে চা খাওয়াতে হবে কিন্তু!’
মনোরমা মজা পেলো । ছেলেটি বেশ কথা বলে, আড়ষ্টতা নেই, ভণিতা নেই, চোখ দুটো ভীষণ প্রাণবন্ত। পাহাড়ি মানুষের মতো একটা সরলতা আছে ওর মধ্যে। সহজেই রাজি হয়ে গেল মনোরমা।



বিকেলে আলো যখন কমতে শুরু করেছে, সে হোটেলের সামনে বাঁধের উপর এসে দাঁড়াল। আসতেই দেখল শুভ আগেই পৌঁছে গেছে। বাঁধ ছেড়ে নিচে নামল ওরা। শুকনো নদীর ভেতর দিয়ে হাঁটতে লাগল। সূর্য তখন নামছে। সাদা-কালো পাথুরে রিভারবেডের উপর গোধূলির লালচে আলো ছড়িয়ে পড়েছে। গাছগুলো কেমন যেন হাত উঁচু করে আকাশের দিকে তাকিয়ে দিনকে বিদায় জানাচ্ছে। আলো ধীরে ধীরে ফিকে হচ্ছে। অন্ধকার বাড়তেই জোনাকিরা তাদের লুকোনো আস্তানা থেকে বেরিয়ে এসেছে। একটুক্ষণের মধ্যেই কেমন দিনের চেনা জায়গাটা অন্য জায়গা হয়ে উঠল।
সেই সকালের নরম আলোর জয়ন্তী আর এই জয়ন্তীর অনেক তফাৎ যেন। একজন যেমন মন নরম করেছিল, আরেকজন কেমন মন উদাস করে দিল। নিজেকে বড় একা লাগে এসময়। মনের মানুষের আঙুলে আঙুল জড়িয়ে হাঁটতে ইচ্ছে করে। নিজের খেয়ালে মনোরমা বারবার হারিয়ে যায়।
ওরা হাঁটতে হাঁটতে সেই ভাঙা ব্রিজটার কাছে পৌঁছাল। কত গল্প হয়তো জড়িয়ে আছে এই ব্রিজের। আরও একটু এগিয়ে শুভ মাওবাদীদের পুড়িয়ে ফেলা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের পুরনো গেস্ট হাউসটা দেখালো। দূরে পারের হোটেল দোকানের আলো জ্বলছে। হালকা বাতাস বইছে। বেশ লাগছিল মনোরমার। মনে হচ্ছিল কত কিছুর সাক্ষী এই ব্রিজ, এই নদী, এই জঙ্গল, এই পোড়া বাড়ি—কত শত গল্প নিয়ে এরা দাঁড়িয়ে আছে নীরবে যুগ যুগ ধরে।
নদী ছেড়ে ওরা বাজারের দিকে এগোল। দু’জনে চা খেয়ে মনোরমা হোটেলে ফিরে এলো। সকাল উঠে মনোরমা সব গুছিয়ে নিল। আজ মনোরমার ফিরে যাওয়ার দিন। দুপুরে বাস আসে, নিউ আলিপুর স্টেশনের সেই বাসে ধরবে সে। মন ভারী লাগছে। আবার ফিরে যেতে হবে সেই জায়গায়, যেখান থেকে ক’দিনের জন্য পালিয়ে এসেছিল জয়ন্তীর কাছে। আর হয়তো কোনোদিন দেখা হবে না রোশনের সাথে, শুভর সাথে।
কাল ওরা তাকে অনেকটা সময় দিয়েছে। আর শুভ! একটা অদ্ভুত ছেলে। এই যুগে মোবাইল ফোন নেই, কোনো সোশ্যাল মিডিয়াতে নেই। ‘বলে এসবের ভালো থেকে খারাপ বেশি। আমার খবর নেওয়ারও কেউ নেই, আর খবর দেওয়ারও নেই। ফোন ছাড়াই বেশ আছি।’ মনোরমার মতোই সৃষ্টিছাড়া সেও। তার ইচ্ছে জঙ্গলের রাস্তায় সেই যেখানে বসতি শেষ আর জঙ্গল শুরু, সেখানে একটা ছোট হোমস্টে করবে। চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে একেবারে পাকাপাকি চলে আসবে জয়ন্তীতে।




পঞ্চম পর্ব:
এখানে একটি বাসই চলে। একবার সকালে আসে আর একবার দুপুরে। এখানকার সাধারণ মানুষের একমাত্র ভরসা। তাই ভিড়ও হয়। সেই কারণেই বাসের সময়ের অনেক আগেই সে বেরিয়ে পড়ল।
বাস স্ট্যান্ডের পাশের পলাশ গাছটার নিচটা পলাশ ফুলে রঙিন হয়ে আছে। যেন স্বপ্নরা বিছিয়ে আছে। মনোরমা ভাবছিল, সেও যদি পারত সব ছেড়ে নতুন করে শুরু করতে… নদীর ধারে, জঙ্গলে ঘেরা একটা ছোট বাড়ি, সাথে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব, আর বিভূতিভূষণরা। শহুরে আধুনিকতার বাইরে এক নিজের জগৎ—সবুজে ঘেরা। ঘুম ভাঙবে পাখিদের ডাকে, অলস দুপুরের সঙ্গী হবে রবীন্দ্রনাথ, বৃষ্টিভেজা বিকেলে গরম চায়ের সাথে জীবনানন্দ, পাতার শিরশিরে শব্দ আর বৃষ্টির ঝমঝম আওয়াজ হবে ঘুমপাড়ানি গান, নদীর কুলকুল শব্দ…স্বপ্নগুলো যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল।
ভাবনায় ছেদ পড়ল বাসের আওয়াজে। মনোরমা বাসে উঠে বসল। জানালার পাশে উদাস মনোরমা তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে — দূরে উঁচু উঁচু গাছের পেছনে মেঘের আড়ালে যে স্বপ্নের জগৎ আছে, বাস্তবের ছোঁয়া যার গায়ে আলগা না, ঠিক সেদিকে। যে উথালপাথাল মন নিয়ে সে এসেছিল, সে ঝড় থেমেছে খানিকটা, অথচ মন ভীষণ ভারী। কিছু যেন হারিয়ে গেছে, কিছু যেন ফেলে যাচ্ছে জয়ন্তীতে।
ঠিক বাস ছাড়ার মুখে হঠাৎ রোশন আর শুভকে দেখতে পেল সে। ওরা জানালার পাশে এসে দাড়ালো। রোশন একটি কথাও বলল না, শুধু একটা কাগজের ঠোঙা মনোরমার হাতে দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। মনোরমার চোখে প্রশ্ন দেখে শুভ বলল, ‘ওটা রেখে দিন, ওটা আপনার জন্য।’ জয়ন্তী কাউকে খালি হাতে ফেরায় না।ভালো থাকবেন. মহাকাল চাইলে আবার দেখা হবে কোনো পথের বাঁকে ।’
মনোরমার বুকের ভেতরটা কেমন হুহু করে উঠল। ঠোঙা খুলে দেখল, অনেকগুলো পলাশ ফুল। গাড়ি ছেড়ে দিল, বাসটা যখন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল, তার চোখ জানালার বাইরে আটকে ছিল অনেকক্ষণ। ধুলো উড়ছে রাস্তার উপর, আর সেই ধুলোর ভেতরেই যেন জয়ন্তী ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে—আর মিশে যাচ্ছে রোশনের
মুখ, শুভর মুখ। খুব কষ্ট হচ্ছে, অথচ কেন সে নিজেও জানে না।
মনোরমা ঠোঙার পলাশ ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখল। গাছ থেকে ঝরে পড়া ফুল। ঝরে পড়া মানেই তো মৃত! অথচ কী সুন্দর। সে ভাবছে, পৃথিবীতে কত রকম মানুষ আছে। অনেকটা এই ফুলের মতোই, সব পরিস্থিতিতেই সুন্দর!যারা আজও বাঁচতে জানে, সব দুঃখ মেনে নিয়েও দিব্যি হাসতে পারে—নকল হাসি নয়, প্রাণখোলা হাসি। যারা নিমেষে মানুষকে আপন করে নিতে জানে, যারা আজও পাশে দাঁড়ায় কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই। এমন মানুষগুলোর জন্যই পৃথিবী আজও সুন্দর।
II
খবরের কাগজ রেখে চোখ বন্ধ করল মনোরমা। মনে করার চেষ্টা করল রোশন আর শুভর সেই রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা শেষ দেখাটা, ধীরে ধীরে আবছা হয়ে যাওয়া সেই মুখ দুটো।
সেদিন মনোরমাকে ফিরে আসতে হয়েছিল তার সেই পুরোনো জগতেই। কিন্তু সে এসেছিল এক নতুন উপলব্ধি নিয়ে। সে বুঝেছিল—জীবনে সব সমস্যার সমাধান নেই। তাদের নিয়েই ঘর করতে হয়, এগিয়ে চলতে হয়। সব পথ খুঁজে পাওয়া যায় না, তবু জীবন থেমে থাকে না। জীবন চলে নিজের গতিতে, পথিক নিয়ে। সময় হলে সময়ই দেখিয়ে দেয় পথ। জীবন কোনো বড় সিদ্ধান্ত নয় , জীবন এই ছোট ছোট মুহূর্তের যোগফল। হাতের মুঠো খুলে যা কিছু আছে, তাই সময়ের হাতে তুলে দিয়ে নতুন করে বেঁচে থাকার নামই হলো জীবন।



