You are currently viewing বরফ, জোছনা আর নিস্তব্ধতা…. ( A Solitude Beyond Words )

বরফ, জোছনা আর নিস্তব্ধতা…. ( A Solitude Beyond Words )

আজ ভোররাতে ঘুম ভেঙে গেল। তখনও আলো ফোটেনি। গভীর রাত, অথচ সেই রাতের মধ্যেও এক অদ্ভুত নরম আলো এসে ঘরটাকে ছুঁয়ে ছিল। আমরা আজ একটা ছোট্ট, নির্জন দ্বীপে আছি। কাল রাতেই এখানে এসে পৌঁছেছি। জমে থাকা সমুদ্রের মাঝে বরফে ঢাকা এক নির্জন দ্বীপ। আমাদের ফেরি সমুদ্রের বরফ কেটে কেটে এগিয়ে এসে আমাদের পৌঁছে দিয়ে রাতেই ফিরে গেছে। গুটিকয়েক থাকার জায়গা, চারপাশে বেশ কিছু গাছপালা, আর তার থেকেও বেশি এক গভীর নিস্তব্ধতা—এই নিয়েই এই দ্বীপ। ঘুম আর এল না। বসার ঘরে এসে দাঁড়ালাম। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম, পৃথিবী তখনও ঘুমিয়ে আছে। জানালার ওপারে যতদূর চোখ যায়, শুধু জমে থাকা বিস্তীর্ণ সমুদ্র—যেন বরফের চাদর মুড়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। চাঁদের আলো বরফের ওপর পড়ে চিকচিক করছে। সেই আলো এত উজ্জ্বল, অথচ এত নরম—মনেই হচ্ছিল না এখনও দিনের আলো ফোটেনি। বাইরেটা দিনের আলোর মতোই ঝকঝকে, কিন্তু সেই আলোয় দিনের কোলাহল নেই। আছে শুধু এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা। বাইরে তখন -২০°, আর আমার ঘরে উষ্ণতার আরাম। আমার আর বাইরের বরফে ঢাকা পৃথিবীর মাঝে শুধু একটা কাচের দেওয়াল! সোফায় একটা চাদর টেনে গুটিসুটি হয়ে বসে রইলাম। অনেকক্ষণ…কোনো কথা নেই, কোনো অস্থিরতা নেই—শুধু তাকিয়ে থাকা। কখনও কখনও জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন কিছুই করতে ইচ্ছে করে না; শুধু দেখতে ইচ্ছে করে। চুপ করে থাকতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, এই মুহূর্তটাকে যদি কোনোভাবে ধরে রাখা যেত!

Full moon shining over a snow-covered frozen sea, seen through a window.
পূর্ণিমার জোছনায় জানালার ওপারে জমে থাকা সমুদ্র—নিস্তব্ধ এক রাত।

অপূর্ব সে শোভা। নিস্তব্ধতার গান বাজছে বাতাসে। মনে হলো, বরফের চাদরে মোড়া গাছপালাগুলোও যেন চুপচাপ দাঁড়িয়ে এই পূর্ণিমা রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করছে—আমারই মতো। বাতাসে যেন ভেসে আসছে সেই পুরোনো গান— “এই রাত তোমার আমার, এই চাঁদ তোমার আমার…” মনে হলো, এই মুহূর্তে গাছগুলো আর আমি—কেউ যেন আলাদা নই। এই বরফ, এই চাঁদ, এই রাত, এই নিস্তব্ধতা—সবকিছু যেন আমার সঙ্গে মিলেমিশে গেছে। আমরা সবাই যেন যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা করে থাকি এমন একটা রাতের জন্য, এমন একটা চাঁদের জন্য, এমন নিস্তব্ধতার জন্য। এমন কোনো রাত-পাখির গানের জন্য, যার শব্দ হয়তো শোনা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়। আর আমরা সবাই যেন সবার মাঝে থেকেও বড় একা! তবু আমরা বেঁচে থাকি এমনভাবে, বহু বছর, শুধু নিস্তব্ধতাকে ভালোবেসে। কারণ এই নিস্তব্ধতার মধ্যেই , সেই একাকিত্বের মধ্যেই, দেখা হয় নিজের সঙ্গে। তাই হয়তো এত কোলাহল, এত ব্যস্ততা, এত মানুষের ভিড়ের মাঝেও কোথাও না কোথাও একটু নিস্তব্ধতার খোঁজ করে মন। ঘড়িতে তখন সকাল ৭টা। ঘড়িতে সকাল হলেও এখানে তখনও রাত। পৃথিবীর এই প্রান্তটা বড় অদ্ভুত। নিজের নিয়মে চলে। আমাদের পরিচিত সময়ের সঙ্গে যেন তার কোনো মিল নেই। দিনের বেলাতেও কখনও কখনও চাঁদের আলো বিছিয়ে থাকে এখানে। শীতকালে এখানে সূর্যমামার যেন ছুটি। জীবন চলে ঘড়ির কাঁটায়, আর প্রকৃতি চলে নিজের ছন্দে। জানালার ওপারে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ খুব ইচ্ছে হলো—এমন একটা রাতে জোছনা মেখে হেঁটে বেড়াই ওই জমে থাকা সমুদ্রের ওপর দিয়ে। হারিয়ে যাই বরফের সমুদ্রে।

পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় জমে থাকা বরফে ঢাকা সমুদ্রের দৃশ্য।
জমে যাওয়া সমুদ্রের বুকে জোছনামাখা এক নিস্তব্ধ রাত।
গোলাপি আভা মাখা আকাশের নিচে জমে থাকা বরফে ঢাকা সমুদ্র, নিচে ফিকে হয়ে আসা পূর্ণিমার চাঁদ।
গোলাপি আকাশের নিচে জোছনা তখনও রয়ে গেছে

গরম পোশাক চাপিয়ে তাই বেরিয়ে পড়লাম বাইরে। দরজা খুলতেই ঠান্ডা বাতাস মুখে এসে লাগল। ঘরের উষ্ণতা পেছনে ফেলে কয়েক পা এগোতেই মনে হলো, আমি যেন অন্য কোনো পৃথিবীতে চলে এসেছি। জমে থাকা বাগান পেরিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম সমুদ্রের দিকে। বরফে তখনও নানা ধরনের তাজা পায়ের ছাপ। সব ছাপ চেনা নয়। তবে কিছু হরিণের, কিছু খরগোশের, কিছু মুজের, আর কিছু অচেনা। বুঝলাম, আমার মতো আরও অনেকে উপভোগ করছিল এই রাতের সৌন্দর্য। আমার মতোই ওরাও ভালোবেসেছে নিস্তব্ধতাকে।

সমুদ্র তখন পুরো জমে রয়েছে। সামনে শুধু বরফ। যে সমুদ্র অবিরাম ছুটে চলে, আজ সে থেমে আছে। কোনো ঢেউ নেই, কোনো আওয়াজ নেই। তার ঢেউগুলোও যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। দিনের আলো ফুটতে শুরু করেছে আস্তে আস্তে। এমন সৌন্দর্য সত্যিই ভাষায় লেখা যায় না। কোথাও কোথাও বরফ জমে ফুলের মতো আকৃতি নিয়েছে। স্বচ্ছ বরফের ভেতরে আটকে আছে ছোট ছোট বুদবুদ। কোথাও ফাটলের রেখা, কোথাও আবার বরফের ওপর ভোরের আলো পড়ে তৈরি করেছে অদ্ভুত নকশা। মনে হচ্ছে, প্রকৃতি নিজেই যেন সারারাত ধরে বসে বসে ছবি এঁকেছে। সে ছবি ক্যামেরায় তোলা যায় না, কারণ সে অনুভূতি কোনো ক্যামেরা ধরে রাখতে পারে না। ছবিতে দেখা যাবে বরফ, চাঁদ, গাছ আর সমুদ্র। কিন্তু সেই মুহূর্তের নিস্তব্ধতা? সেই শীতল স্পর্শ? সেই একা দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতি? নিজের এত কাছে চলে আসার সেই অদ্ভুত অনুভূতি? সেগুলো তো শুধু মনে থেকেই যায়। সেই জমে যাওয়া সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, পৃথিবী আসলে কত বড়! আর আমরা তার কতটুকুই বা দেখি! কত শহর, কত রাস্তা, কত মানুষের ভিড় পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষ এমন একটা জায়গাতেই এসে দাঁড়ায়—যেখানে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। আছে শুধু শান্তি। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। মাথার ওপরে গোলাপি আভা মাখা আকাশ, দিনের আলোয় ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসা চাঁদ, আর চারিধারে ধু ধু করে ছড়িয়ে থাকা দুধসাদা বরফে মোড়া সমুদ্র- মাঝখানে শুধু আমি, যে পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল ভুলে শুধু নীরবতাকে ভালোবেসেছিল।

১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মুন রায়
তোরসো, ফিনল্যান্ড

বরফের ওপর হরিণের পায়ের ছাপ।
দুধসাদা বরফের ওপর পায়ের ছাপ তখনও স্পষ্ট
জমে যাওয়া সমুদ্রের বরফে ফুল ও পাতার মতো আকৃতি।
বরফের বুকে প্রকৃতির আঁকা ফুল-পাতার নকশা

Moon Ray

A traveller with soul of a Nomad

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.